মালয়েশিয়া কুয়ালালামপুরে ইন্ডাস্ট্রিঅলের গ্লোবাল অর্গানাইজিং কনফারেন্সে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে; শ্রমিক সংগঠিতকরণ, HRDD, আন্তর্জাতিক সংহতি ও ন্যায্য রূপান্তরে গুরুত্বারোপ
বিশ্বজুড়ে ট্রেড ইউনিয়ন দমন, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার বাধাগ্রস্ত করা, ইউনিয়ন নেতাদের চাকরিচ্যুত করা এবং যৌথ দর-কষাকষির অধিকার সীমিত করার নানা প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা। যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা থেকে জার্মানি, সুইডেন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও তুরস্ক পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে, শ্রমিকদের ঐক্য দুর্বল করতে নিয়োগকর্তারা নানা কৌশল ব্যবহার করছেন। এসব বাধা মোকাবিলায় কর্মক্ষেত্রভিত্তিক সংগঠিতকরণ, আন্তর্জাতিক সংহতি, সামাজিক সংলাপ এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ৮ ও ৯ অক্টোবর ২০২৬ অনুষ্ঠিত ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়নের (IndustriALL Global Union) প্রথম গ্লোবাল অর্গানাইজিং কনফারেন্সে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা এসব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সম্মেলনে প্রায় ১৩০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণ করেন মো. হাসান আলী ও নাজমা আক্তার। গার্মেন্টস শ্রমিকদের সংগঠিতকরণ, ট্রেড ইউনিয়নের শক্তি বৃদ্ধি, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং মানবাধিকার যথাযথ যাচাই বা হিউম্যান রাইটস ডিউ ডিলিজেন্স (Human Rights Due Diligence (HRDD) ছিল আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শ্রমিকদের সম্মিলিত শক্তি কীভাবে বাড়ানো যায়, নতুন শিল্পে শ্রমিকদের সংগঠিত করা যায় এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার সুরক্ষিত রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
আলাবামায় মার্সিডিজ-বেঞ্জ কারখানায় ইউনিয়নবিরোধী প্রচারণা, সম্মেলনের প্রথম দিনের শেষ অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের United Auto Workers (UAW) International Union-এর ক্রিস্টিন পিটার আলাবামায় মার্সিডিজ-বেঞ্জ কারখানায় ইউনিয়ন গঠনের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রচারণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এটি ছিল তাঁর দেখা সবচেয়ে আগ্রাসী ইউনিয়নবিরোধী প্রচারণাগুলোর একটি।
তিনি জানান, কারখানায় যাওয়ার সড়কে বিলবোর্ড স্থাপন, রেডিও বিজ্ঞাপন প্রচার এবং রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে ইউনিয়নবিরোধী প্রচারণা চালানো হয়। কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের সুপারভাইজারদের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে ডাকা হয়। সেখানে কারখানা মেক্সিকোতে স্থানান্তরিত হতে পারে এমন পরোক্ষ হুমকি দেওয়া হয় এবং ইউনিয়নবিরোধী ভিডিও দেখানো হয়। ভোটের শেষ কয়েক সপ্তাহে ১১ জন পরামর্শক দিনরাত কারখানার ভেতরে অবস্থান করেন।
শেষ পর্যন্ত UAW-এর ইউনিয়ন গঠনের ভোটে পরাজয় ঘটে। তবে মার্সিডিজ-বেঞ্জ কর্তৃপক্ষ দাবি করে, তারা নিরপেক্ষ ছিল।
এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের চ্যাটানুগায় ভক্সওয়াগেন কারখানায় এমন একটি চুক্তি হয়েছিল, যার মাধ্যমে ইউনিয়নবিরোধী প্রচারকদের কারখানার ভেতরে প্রবেশ ঠেকানো হয় এবং শ্রমিকেরা ইউনিয়নের পক্ষে ভোট দেন। সম্মেলনে জানানো হয়, IndustriALL মার্সিডিজ-বেঞ্জের সঙ্গে তাদের বৈশ্বিক চুক্তি স্থগিত করেছে। আলাবামায় দ্বিতীয়বার ইউনিয়ন গঠনের ভোট হলে কোম্পানিটি অবস্থান পরিবর্তন করবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
জার্মানিতে টেসলার বিরুদ্ধে ইউনিয়নবিরোধী কার্যক্রম, জার্মানির IG Metall-এর ক্লডিয়া রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে দেখা ইউনিয়নবিরোধী কৌশল ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়েছে। বার্লিনের কাছে গ্রুনহাইডে টেসলার কারখানায় প্রায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার মানুষ কাজ করেন। তাঁদের অনেকেই তরুণ অভিবাসী শ্রমিক, যাঁদের আগে শিল্পকারখানায় কাজের অভিজ্ঞতা ছিল না।
IG Metall-এর অভিযোগ অনুযায়ী, শ্রমিকদের মধ্যে সংহতি দুর্বল করা, কারখানার ভেতরে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং ওয়ার্কস কাউন্সিলের কার্যক্রমকে দুর্বল করার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। শ্রমিকদের হাতে ‘Giga yes, union no’ লেখা ব্যাজও দেওয়া হয়েছে। এর জবাবে IG Metall ‘Union yes’ স্লোগান সামনে আনে।
সুইডেনে টেসলার বিরুদ্ধে এক হাজার দিনের বেশি ধর্মঘট, সুইডেনের IF Metall-এর ইয়োহান ইয়ারভক্লো বলেন, সুইডেনের প্রায় ৯০ শতাংশ কোম্পানি যৌথ চুক্তির আওতায় রয়েছে। তাই টেসলার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুধু একটি কোম্পানির সঙ্গে বিরোধ ছিল না; এটি ছিল দেশের দীর্ঘদিনের শ্রমসম্পর্কের মডেল রক্ষার লড়াই।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, টেসলার স্থানীয় ব্যবস্থাপনার যৌথ চুক্তি নিয়ে আপত্তি না থাকলেও ইলন মাস্ক তা অনুমোদন করেননি এবং ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগেরও জবাব দেননি।
IF Metall এক হাজার দিনেরও বেশি সময় ধর্মঘট চালায়, যা আধুনিক সুইডেনের ইতিহাসে দীর্ঘতম ধর্মঘট হিসেবে সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। সুইডেন ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ আন্দোলনের প্রতি ব্যাপক সমর্থন ছিল। তবে টেসলা ধর্মঘট ভাঙতে বিকল্প শ্রমিক নিয়োগ করে, যা ১৯৩৮ সাল থেকে সুইডেনে চলে আসা একটি অলিখিত প্রথার বিরোধী বলে ইউনিয়নের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়।
শেষ পর্যন্ত টেসলা ধর্মঘটে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের আর্থিক সুবিধা দিয়ে কোম্পানি থেকে বিদায় করে। ধর্মঘটে অংশ নেওয়া সদস্যরা সরে যাওয়ায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি সুইডেনের শ্রমসম্পর্কের মডেল বদলে দিয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ইয়োহান বলেন, ‘একেবারেই না।’ তাঁর মতে, ইউনিয়নগুলো এখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর করছে। এর মধ্যে Klarna, Ryanair এবং গেমিং প্রতিষ্ঠান King-ও রয়েছে। যৌথ চুক্তির প্রতি জনসমর্থনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সম্মেলনে IF Metall-এর ধর্মঘটের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আরও তথ্যের জন্য একটি অনলাইন লিংক দেওয়া হয়: https://shorturl.at/brQJc
থাইল্যান্ডে বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে শ্রমিকদের অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, থাইল্যান্ডের Confederation of Industrial Labour-এর কিট্টিসাক প্রিয়াংক্রাটোক জানান, চীনা বিনিয়োগের কারণে দেশটির বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু শ্রমিকেরা এর মূল্য দিচ্ছেন অনিশ্চিত কর্মসংস্থান ও অধিকারসংকটের মাধ্যমে।
তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বড় চীনা কোম্পানিগুলোর কিছু প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন গঠনে বাধা দেয়, শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে এবং ছাঁটাইয়ের সময় প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ দেয় না। শ্রমিকদের এক বছরের চুক্তিতে এবং সুপারভাইজারদের তিন বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। অনেক শ্রমিক সাবকন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে কাজ করেন।
কিট্টিসাক এসব পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর বলে উল্লেখ করেন। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ডের আইনে এ ধরনের সব আচরণ অবৈধ নয়। স্বল্পমেয়াদি চুক্তি শ্রমিকদের ইউনিয়নে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করে এবং তাঁদের সংগঠিত করা কঠিন করে তোলে।
মালয়েশিয়ায় অভিবাসী শ্রমিকদের সংগঠিত করার আহ্বান, মালয়েশিয়ার NUTEAIW-এর গোপাল কৃষ্ণন বলেন, নিয়োগকর্তারা অভিবাসী ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থানে থাকা শ্রমিকদের ব্যবহার করে ট্রেড ইউনিয়নের শক্তি দুর্বল করার চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, ‘নিয়োগকর্তারা যদি ট্রেড ইউনিয়নের শক্তি দুর্বল করতে অভিবাসী শ্রমিকদের ব্যবহার করেন, তাহলে আমাদের জবাব হতে হবে অভিবাসী শ্রমিকদের সংগঠিত করা।’ সম্মেলনে অভিবাসী শ্রমিকদের বাদ না দিয়ে তাঁদের ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তুরস্কে ইউনিয়ন কার্যক্রমে যুক্ত থাকায় শ্রমিক ছাঁটাই, তুরস্কের Selüloz-İş-এর আইকুত গুনেশ জানান, ইউনিয়ন কার্যক্রমে যুক্ত থাকার কারণে প্রতিবছর ২ হাজার ৫০০-এর বেশি শ্রমিক চাকরিচ্যুত হন বলে তাঁদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে। কোম্পানিগুলো ইউনিয়ন সংগঠনের উদ্যোগ শনাক্ত করার পরপরই সংগঠকদের লক্ষ্যবস্তু করে।
তিনি আরও জানান, তুরস্কের আইনেও সংগঠিতকরণের ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। একটি ইউনিয়ন কেবল যে শিল্প খাতে নিবন্ধিত, সেই খাতেই শ্রমিক সংগঠিত করতে পারে। ফলে কাগজশিল্পের ইউনিয়ন ধাতুশিল্পে শ্রমিক সংগঠিত করতে পারে না।যৌথ দর-কষাকষির অধিকার পেতে সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের জাতীয় পর্যায়ের মোট শ্রমিকের অন্তত এক শতাংশকে সংগঠিত করতে হয়। কিছু খাতে এই শর্ত পূরণ করতে ১০ হাজারের বেশি সদস্য প্রয়োজন হয়।
এমনকি শ্রমিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন অর্জন এবং মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দর-কষাকষির অধিকার নিশ্চিত হওয়ার পরও নিয়োগকর্তারা আদালতে মামলা করেন। এসব মামলা বছরের পর বছর চলতে পারে। এ সময় সদস্যরা ইউনিয়ন থেকে সরে যান এবং শেষ পর্যন্ত কোনো যৌথ চুক্তি ছাড়াই বিরোধের অবসান ঘটে। শ্রমিকদের চাকরি সুরক্ষিত রাখতে অনেক ইউনিয়নকে তাই গোপনে সংগঠিত হওয়ার কৌশল নিতে হয়।
আন্তর্জাতিক প্রচারণা ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার কৌশল, সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় ইউনিয়ন দমনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কীভাবে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশন, OECD-এর অভিযোগ প্রক্রিয়া, দায়িত্বশীল খনি ও ব্যাটারি উৎপাদনের মানদণ্ড, গ্লোবাল ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট, ইউরোপীয় ও বৈশ্বিক ওয়ার্কস কাউন্সিল এবং কোম্পানিভিত্তিক ইউনিয়ন নেটওয়ার্কের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া কৌশলগত করপোরেট গবেষণা, পুঁজি ও বিনিয়োগের ওপর চাপ সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, মানবাধিকার যথাযথ যাচাই (Human Rights Due Diligence (HRDD), কম্বোডিয়া চুক্তিসহ বাধ্যতামূলক বৈশ্বিক চুক্তি এবং গণমাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি তুলে ধরার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
বক্তারা বলেন, কর্মক্ষেত্রভিত্তিক ‘গ্রাউন্ড ক্যাম্পেইন’ শ্রমিকদের সংগঠিত করে ভেতর থেকে শক্তি গড়ে তোলে। অন্যদিকে ‘এয়ার ক্যাম্পেইন’ আন্তর্জাতিক প্রচারণা, গণমাধ্যম ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর ওপর চাপের মাধ্যমে কোম্পানিকে জবাবদিহির আওতায় আনে। কার্যকর শ্রমিক আন্দোলনের জন্য এই দুই কৌশলের সমন্বয় জরুরি।
ইন্ডাস্ট্রিঅলের প্রথম গ্লোবাল অর্গানাইজিং কনফারেন্স, কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ইন্ডাস্ট্রিঅলের প্রথম গ্লোবাল অর্গানাইজিং কনফারেন্সে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১৩০ জন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ও শ্রমিক প্রতিনিধি অংশ নেন। সম্মেলনের মূল প্রশ্ন ছিল পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কীভাবে ট্রেড ইউনিয়নের শক্তি গড়ে তোলা যায় এবং তা দীর্ঘস্থায়ী করা যায়।
ইন্ডাস্ট্রিঅলের সহকারী সাধারণ সম্পাদক কান মাতসুজাকি বলেন, OECD দেশগুলোতে ১৯৮৫ সালের পর থেকে ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যপদের হার অর্ধেকে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, বিশ্বের মোট সম্পদের ৭৫ শতাংশের মালিক সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষ।
ইন্দোনেশিয়ার ব্যাটারি সরবরাহব্যবস্থা থেকে মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর শিল্প পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে সংগঠিতকরণে সহায়তা দিতে ইন্ডাস্ট্রিঅলের নতুন প্রচারণা ও সংগঠিতকরণ তহবিল কাজ করছে। এর লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ও কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলা।
বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণ: শ্রমিকদের সংগঠিতকরণ ও HRDD, সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণ করেন মো. হাসান আলী ও নাজমা আক্তার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের মতো বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত খাতে শ্রমিকদের সংগঠিতকরণ, ট্রেড ইউনিয়নের শক্তি বৃদ্ধি, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং মানবাধিকার যথাযথ যাচাইয়ের গুরুত্ব এ সম্মেলনের আলোচনার সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
HRDD-এর মাধ্যমে কোম্পানি ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং সরবরাহব্যবস্থায় শ্রমিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি শনাক্ত, প্রতিরোধ, প্রশমন ও প্রতিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের সংগঠন ও প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে শ্রমিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশের গার্মেন্টসশিল্পের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনভাবে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও কার্যক্রম পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করা, নারী ও তরুণ শ্রমিকদের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, যৌথ দর-কষাকষি শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সম্মেলনে আলোচিত কর্মক্ষেত্রভিত্তিক শ্রমিক সংগঠিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোম্পানির ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, সামাজিক সংলাপ জোরদার এবং ন্যায্য কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মানবাধিকার যথাযথ যাচাই কার্যকর হতে পারে না এ বিষয়টিও আলোচনার প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
শ্রমিক সংগঠিত করার তিন ধাপ: ক্ষোভ, আশা ও পদক্ষেপ, সম্মেলনে জার্মানির IG Metall-এর ক্লডিয়া রহমান, ইন্দোনেশিয়ার FARKES-এর ইভি কৃষ্ণবতী এবং ইন্ডাস্ট্রিঅলের সংগঠিতকরণ পরামর্শক অ্যারন চ্যাপেল শ্রমিক সংগঠিত করার কৌশল তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, নারী, তরুণ, অফিসভিত্তিক পেশাজীবী ও অভিবাসী শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করে বৈচিত্র্যময় এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
তাঁদের মতে, কার্যকর সংগঠিতকরণের প্রথম ধাপ হলো শ্রমিকদের কথা শোনা এবং তাঁদের ক্ষোভের কারণ চিহ্নিত করা। দ্বিতীয় ধাপে ঐক্যবদ্ধ হলে কী কী অধিকার অর্জন সম্ভব, সে বিষয়ে আশা তৈরি করতে হবে। তৃতীয় ধাপে শ্রমিকদের সম্মিলিত পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ক্ষোভের সঙ্গে আশা এবং আশার সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপ যুক্ত না হলে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সম্মেলনে ‘ফিশ ট্যাংক’ মডেলের মাধ্যমে সংগঠিতকরণের ধাপগুলোও ব্যাখ্যা করা হয়। প্রথমে নীরবে শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ, নেতৃত্ব নির্বাচন এবং সংগঠিতকরণ কমিটি গঠন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ভিত্তি শক্তিশালী হলে প্রচারণা প্রকাশ্যে আসে। শ্রমিকেরা ইউনিয়নের পক্ষে সমর্থন জানান, ভোট দেন এবং সম্মিলিত কর্মসূচিতে অংশ নেন। প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও কোম্পানির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো কার্যকর প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা এবং যৌথ দর-কষাকষির মাধ্যমে যৌথ চুক্তি অর্জন।
এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানো এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ আছে কি না, সেটিকেও সংগঠিতকরণের মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভবিষ্যৎ শিল্পে শ্রমিক সংগঠিত করার প্রয়োজনীয়তা, সম্মেলনে ব্যাটারি সরবরাহব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সেমিকন্ডাক্টর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো দ্রুত বিকাশমান শিল্পে শ্রমিক সংগঠিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রচলিত শিল্পে ইউনিয়নের শক্তি বৃদ্ধি এবং নারী, তরুণ, অভিবাসী ও অফিসভিত্তিক পেশাজীবীদের সংগঠনের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
কঙ্গো: কোবাল্ট খনিতে শ্রমিকদের ঝুঁকি, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের TUMEC-এর প্লাসিদ আদ্রুপিয়াকো মিনোটা জানান, মোবাইল ফোন ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে ব্যবহৃত কোবাল্ট উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শ্রমিকেরা ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী পান না, আইনগত ন্যূনতম দৈনিক মজুরি প্রায় ৯.৩০ মার্কিন ডলার হলেও তা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হয় না, অতিরিক্ত কাজের মজুরি দেওয়া হয় না এবং সাবকন্ট্রাক্টিং ব্যাপকভাবে প্রচলিত। শ্রমিকদের সুরক্ষায় ইউনিয়ন সরকারকে শ্রম আইন কার্যকর করার আহ্বান জানাচ্ছে, খনি শ্রমিকদের জন্য যৌথ চুক্তি দাবি করছে এবং অনানুষ্ঠানিক ও সাবকন্ট্রাক্টভিত্তিক শ্রমিকদের সংগঠিত করছে।
সিঙ্গাপুর: সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সংগঠিতকরণ, সিঙ্গাপুরের UWEEI-এর সিন হিং মুন ব্যাখ্যা করেন, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ফলে এই খাতে শ্রমিকদের অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংগঠিতকরণ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অফিসভিত্তিক পেশাজীবীদের সংগঠিত করা, ফ্রান্সের CFE-CGC-এর কোরিন শেভিন বলেন, অফিসভিত্তিক পেশাজীবীদের সংগঠিত করতে ইউনিয়নগুলোর সুস্পষ্ট কৌশল থাকা প্রয়োজন। অনেক দেশে ইউনিয়নের গঠনতন্ত্রে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও নেই।
তবে এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসছে। তুরস্কে আদালতের একটি রায় টায়ারশিল্পে অফিসভিত্তিক কর্মীদের জন্য Lastik-ş-এর দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় NUMSA তাদের কার্যক্রমের পরিধি বাড়িয়ে প্রযুক্তিবিদ, প্রকৌশলী এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করেছে।
ভারত: পোশাকশিল্পে দীর্ঘমেয়াদি সংগঠিতকরণ, Unions United-এর দিথি ভট্টাচার্য বলেন, ভারতের বেঙ্গালুরুতে পোশাকশিল্পের ইউনিয়নগুলো প্রায় ২০ বছর ধরে প্রথম প্রজন্মের শ্রমিকদের সংগঠিত করে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেছে। কিন্তু শিল্প গ্রামীণ এলাকায় স্থানান্তরিত হওয়ায় অনেক জায়গায় আবার শুরু থেকে সংগঠিতকরণের কাজ করতে হচ্ছে। অনেক শ্রমিক ইউনিয়ন সম্পর্কে জানেন না। ফলে তাঁদের প্রথমে বোঝাতে হচ্ছে, যৌথ সংগঠন কী এবং ট্রেড ইউনিয়ন কেন প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলো আগের তুলনায় বড় ও শক্তিশালী হয়েছে এবং ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধও কঠোর হয়েছে।
কম্বোডিয়া: সরাসরি যোগাযোগ ও ডিজিটাল সহায়তা, কম্বোডিয়ার CWLFU-এর রাভি হেং জানান, তাঁদের সংগঠকেরা সরাসরি শ্রমিকদের সঙ্গে দেখা করেন এবং ইউনিয়ন কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তা ব্যাখ্যা করে তথ্যপত্র বিতরণ করেন। তরুণ শ্রমিকদের আইনি পরামর্শ ও সহায়তা দিতে Telegram, Facebook এবং WhatsApp ব্যবহার করা হয়।
বিরোধ দেখা দিলে প্রথমে জাতীয় পর্যায়ের বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। তাতে সমাধান না হলে IndustriALL-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংহতি গড়ে তোলা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কারখানা থেকে পণ্য কেনা বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।
ইন্দোনেশিয়া, হাঙ্গেরি ও জিম্বাবুয়ের অভিজ্ঞতা, ইন্দোনেশিয়ার SPN-এর একো পুরওয়ান্তোরো জানান, দেশটির ব্যাটারি সরবরাহব্যবস্থার অনেক কর্মক্ষেত্র প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। সেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে শ্রমিকদের সংগঠিত করা হচ্ছে। শ্রমিকেরা বিরোধের সময় সুরক্ষা এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ পাওয়ার জন্য ইউনিয়নে যোগ দিচ্ছেন। সদস্যসংখ্যা বাড়ায় বিরোধ নিষ্পত্তি ও শ্রমিকদের সহায়তার জন্য আরও সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
হাঙ্গেরির VDSZ-এর সেকেই তামাস বলেন, গত ছয় বছরে নির্মিত ব্যাটারি কারখানাগুলোতে কাজের পরিবেশ দুর্বল, শ্রমিকদের চাকরি ছাড়ার হার বেশি এবং ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব ও সামাজিক সংলাপ সীমিত। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় VDSZ, IndustriALL এবং IndustriAll Europe পাঁচটি দেশে একটি প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য কার্যকর সামাজিক সংলাপ প্রতিষ্ঠা ও ট্রেড ইউনিয়নকে শক্তিশালী করা।
জিম্বাবুয়ের ZDAMWU-এর সাধারণ সম্পাদক জাস্টিস চিনহেমা বলেন, চীনা মালিকানাধীন খনি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে শ্রমিক সংগঠিত করা কঠিন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা যা কিছু করি, তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সংগঠিতকরণ। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমিই প্রধান সংগঠক।’
ভারতের জাহাজভাঙা শিল্পের অভিজ্ঞতা, ভারতের প্রথম স্বীকৃত জাহাজভাঙা শিল্পের ইউনিয়ন Alang Sosiya Ship Recycling & General Workers’ Association-এর বিদ্যাধর রানে তাঁদের সংগঠনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, অধিকার এবং কার্যকর প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠায় ইউনিয়নের ভূমিকা নিয়ে তাঁর বক্তব্য সম্মেলনের আলোচনায় স্থান পায়।
বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক শিক্ষা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প, জাহাজভাঙা শিল্প, ট্যানারি, ব্যাটারি ও অন্যান্য উৎপাদন খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষেত্রে ইউনিয়ন গঠনে বাধা, ইউনিয়ন নেতাদের হয়রানি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে চাকরির ঝুঁকি মোকাবিলায় এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:
১. শ্রমিকদের বাস্তব সমস্যা শুনে কর্মক্ষেত্রভিত্তিক শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা।
২. নারী ও তরুণ শ্রমিকদের নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৩. চুক্তিভিত্তিক, সাবকন্ট্রাক্টভিত্তিক ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থানে থাকা শ্রমিকদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া।
৪. আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন নেটওয়ার্ক, বৈশ্বিক ব্র্যান্ড এবং শ্রম অধিকারবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো।
৫. শ্রমিক, নিয়োগকর্তা ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সামাজিক সংলাপ এবং যৌথ দর-কষাকষির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
৬. মানবাধিকার যথাযথ যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় শ্রমিক ও তাঁদের প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সরবরাহব্যবস্থায় অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রতিকার চাওয়া।
৭. সবুজ প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয়করণ ও শিল্পের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সময় শ্রমিকদের চাকরি, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং মর্যাদাপূর্ণ কাজ নিশ্চিত করা।
‘গ্রেভইয়ার্ড টু গ্রিনইয়ার্ড’: ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প থেকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব কর্মক্ষেত্র, ‘Graveyard to Greenyard’ বা ‘কবরস্থান থেকে সবুজ প্রাঙ্গণ’ ধারণাটি বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বিপজ্জনক ও দূষণকারী কর্মক্ষেত্রকে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং শ্রমিকের অধিকারসম্মত শিল্পে রূপান্তর করতে হবে। এ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের বাদ দেওয়া যাবে না; তাঁদের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
ন্যায্য রূপান্তরের লক্ষ্য শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়; একই সঙ্গে শ্রমিকের জীবন, জীবিকা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান সুরক্ষিত করা। শিল্পের পরিবেশগত উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুফল শ্রমিকদের কাছেও পৌঁছাতে হবে, যাতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরির পাশাপাশি তাঁদের জীবিকা ও অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
আন্তর্জাতিক ঐক্যই শ্রমিকদের সম্মিলিত শক্তির ভিত্তি, ইন্ডাস্ট্রিঅলের গ্লোবাল অর্গানাইজিং কনফারেন্সের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা ও ট্রেড ইউনিয়নকে শক্তিশালী করতে শুধু কর্মক্ষেত্রের আন্দোলন যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংহতি, কৌশলগত প্রচারণা, সামাজিক সংলাপ, যৌথ দর-কষাকষি, মানবাধিকার যথাযথ যাচাই এবং শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ যুক্ত করতে হবে।
আলাবামা থেকে আঙ্কারা, ইউরোপের গাড়ি কারখানা থেকে এশিয়ার গার্মেন্টস ও ব্যাটারি সরবরাহব্যবস্থা বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার রক্ষায় স্থানীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ প্রয়োজন। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শ্রমিকদের সম্মিলিত শক্তিই ন্যায্য, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
মো. হাসান আলী: সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (বিএনটিইউএফ)