• আপডেট টাইম : 19/07/2026 11:40 PM
  • 2386 বার পঠিত
  • হাসান আলী
  • sramikawaz.com

বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই বাংলাদেশ যেন অন্য এক দেশে পরিণত হয়। বাড়ির ছাদে উড়তে থাকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন কিংবা জার্মানির পতাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় প্রিয় দলকে ঘিরে তর্ক-বিতর্কে। চায়ের দোকান থেকে অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রামের আড্ডা—সর্বত্র ফুটবল নিয়ে উৎসবের আমেজ। সাম্প্রতিক সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরবি হরফে কালিমাখচিত বিশেষ নকশার সাদা পতাকা প্রদর্শন নিয়ে নতুন বিতর্ক। একদিকে বিশ্বকাপের উন্মাদনা, অন্যদিকে ধর্মীয় প্রতীককে ঘিরে আলোচনা—দুই ক্ষেত্রেই মানুষের আবেগ, অংশগ্রহণ ও মতবিনিময় চোখে পড়ার মতো। গণতান্ত্রিক সমাজে মানুষ তার পছন্দ, বিশ্বাস কিংবা পরিচয় প্রকাশ করতেই পারে। খেলাধুলার প্রতি সমর্থন কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ উভয়ই নাগরিক স্বাধীনতার অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে কী রয়েছে? আমরা কোন বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই, আর কোন বিষয়কে সহজেই ভুলে যাই?

স্বাধীনতার ৫৪ বছরে শ্রমিকের উন্নয়ন ও অগ্রগতি কোথায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে স্বাধীনতার ৫৪ বছরের বাংলাদেশের দিকে তাকাতে হয়। এ সময়ে দেশ অর্থনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তৈরি পোশাকশিল্প বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি খাতে পরিণত হয়েছে; প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎসে রূপান্তরিত হয়েছে। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতির পরিধি বহুগুণ বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশ আজ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের কাতারে পৌঁছানোর পথে।

কিন্তু এই অগ্রগতির ভিত্তি কারা নির্মাণ করেছেন? উত্তরটি স্পষ্ট—কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ। তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, গৃহশ্রমিক, চামড়াশিল্প ও জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিক, বিদ্যুৎ, মৎস্য ও সেবা খাতের কর্মী এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের শ্রম, ঘাম, দক্ষতা ও ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশের অর্থনীতি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে তাঁদের নিরলস পরিশ্রমের গল্প।

তবু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর একটি মৌলিক প্রশ্ন আজও অনিবার্য—এই শ্রমিকদের জীবন, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও মর্যাদা কতটা নিশ্চিত হয়েছে? অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল কি তাঁদের জীবনেও সমানভাবে প্রতিফলিত হয়েছে? উৎপাদন ও রপ্তানি যেমন বেড়েছে, তেমনি কি বেড়েছে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাস্থ্যসেবা, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শ্রমিকের অধিকার? নাকি উন্নয়নের সুফল মূলত অর্থনীতির সূচকেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, আর শ্রমিকের জীবনে রয়ে গেছে পুরোনো অনিশ্চয়তা, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও বৈষম্য?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব আশাব্যঞ্জক নয়। আজও প্রতিরোধযোগ্য কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় শ্রমিক প্রাণ হারান, অনেক শ্রমিক অসুস্থ অবস্থায়ও কাজ করতে বাধ্য হন, কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, আর দুর্ঘটনার পর বহু পরিবারকে দীর্ঘদিন ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অর্থাৎ অর্থনীতির চাকা যত দ্রুত ঘুরেছে, শ্রমিকের জীবনমান ও নিরাপত্তা সেই অনুপাতে এগোয়নি। এ বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল জিডিপি, রপ্তানি বা প্রবৃদ্ধির হার নয়; বরং সেই উন্নয়ন দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক করেছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় বাজেটে শ্রমিকের প্রত্যাশা এখনো অপূর্ণ

প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে অবকাঠামো, মেগা প্রকল্প, শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এসব খাত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে শ্রমিকদের শ্রমে এই উন্নয়নের ভিত্তি নির্মিত হয়, তাঁদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণের জন্য বরাদ্দ এবং নীতিগত অগ্রাধিকার এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রতিফলিত হয় না।

পেশাগত স্বাস্থ্যসেবা, কর্মক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কার্যকর সেফটি কমিটি, শক্তিশালী শ্রম পরিদর্শন, পেশাগত রোগ প্রতিরোধ এবং কর্মক্ষেত্রে নিহত বা আহত শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য স্পষ্ট ও পর্যাপ্ত বাজেটীয় প্রতিশ্রুতি এখনো সীমিত। একইভাবে অনানুষ্ঠানিক খাতের কোটি কোটি শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যও একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।

যদি শ্রমিকই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হন, তবে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেটের কেন্দ্রেও তাঁদের স্থান থাকা উচিত। কারণ শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কল্যাণে ব্যয় কোনো অনুদান বা দয়া নয়; এটি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দুর্ঘটনা হ্রাস, শিল্পের স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ। একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের বাজেট কেবল অবকাঠামো নির্মাণে নয়, সেই অবকাঠামো নির্মাণকারী মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষার্থেও সমান গুরুত্ব দেয়।

নারী শ্রমিক লিজা আক্তারের মৃত্যু: একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

এই বৃহত্তর বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৬ সালের ২৪ জুন গাজীপুরের শ্রীপুরে ‘কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেড’ কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিক লিজা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের সামনে এক গভীর মানবিক ও নীতিগত প্রশ্ন তুলে ধরেছে। সহকর্মীদের অভিযোগ, অসুস্থ অবস্থায় তিনি একাধিকবার ছুটি ও চিকিৎসার সুযোগ চাইলেও তা পাননি। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তিনি মারা যান। অভিযোগগুলোর সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। যদি প্রমাণিত হয় যে অবহেলা, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তবে দায়ীদের জবাবদিহির আওাতে আনা শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও।

লিজার মৃত্যুর পর তাঁর সহকর্মীরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। তাঁদের প্রশ্ন ছিল অত্যন্ত মৌলিক—কেন একজন অসুস্থ শ্রমিক সময়মতো চিকিৎসা পেলেন না? কেন একটি কর্মক্ষেত্রে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেল না? কিন্তু জনপরিসরের আলোচনায় প্রধান হয়ে ওঠে যানজট, ভাঙচুর কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। ফলে কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, নিয়োগকর্তার দায়িত্ব এবং শ্রমিকের অধিকারের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো তুলনামূলকভাবে আড়ালে চলে যায়। এটি শুধু একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; বরং আমাদের সামাজিক অগ্রাধিকার ও জনআলোচনার চরিত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে।

বাস্তবতা হলো, লিজা আক্তারের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা সংকটের একটি প্রতীক। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই দেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ১৮৬ জন শ্রমিক নিহত এবং ৩৩৫ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৮৫ জন পুরুষ এবং একজন নারী শ্রমিক। পরিবহন, কৃষি, নির্মাণ, মৎস্য, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আহতদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশই তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি কর্মজীবন এবং একটি অপূরণীয় ক্ষতির গল্প। লিজা আক্তারের মৃত্যু সেই দীর্ঘ তালিকার আরেকটি নাম হয়ে থাকুক—এটি কোনো সভ্য ও মানবিক সমাজের কাম্য হতে পারে না।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির এক যুগ পরও শ্রমিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

২০১৩ সালের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের শিল্প ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনাগুলোর একটি। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগে, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা এবং কারখানা পরিদর্শন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতা, সরকার, কারখানা মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারও বাস্তবায়িত হয়েছে।

তবে এই অগ্রগতি এখনো সব খাতে সমানভাবে পৌঁছায়নি। অনানুষ্ঠানিক খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি, মৎস্য, জাহাজভাঙা শিল্প এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এখনো সর্বজনীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

শ্রম বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর সেফটি কমিটি গঠন, স্বাধীন ও শক্তিশালী শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থা, পেশাগত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। কিন্তু বাস্তবায়নের গতি এখনো প্রত্যাশিত নয়। ফলে রানা প্লাজার মতো বড় দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটলেও, প্রতিদিন বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ছোট-বড় দুর্ঘটনায় শ্রমিকের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এটি স্পষ্ট করে যে, শ্রমিক নিরাপত্তাকে শুধু একটি খাতের নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও মানবাধিকারের একটি কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

সাদা পতাকার উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে সাদা পতাকা প্রদর্শন নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এগুলোকে ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও নিরাপত্তা বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী নেতা এবং শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের একটি অংশ সতর্ক করেছেন যে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রতীক আন্তর্জাতিকভাবে ভুল ব্যাখ্যা হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমন ভুল ব্যাখ্যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, বিদেশি বিনিয়োগ, তৈরি পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

এই উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, একটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শুধু কোনো পতাকা, প্রতীক বা জনসমাবেশের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। একটি দেশের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় সে দেশ তার নাগরিকদের কতটা মর্যাদা দেয়, আইনের শাসন কতটা কার্যকর, মানবাধিকার কতটা সুরক্ষিত এবং শ্রমিকের জীবন কতটা নিরাপদ—এসব সূচকের ভিত্তিতে। আজ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা শুধু পণ্যের দাম দেখেন না; তাঁরা শ্রম অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, করপোরেট জবাবদিহি, পরিবেশগত মান এবং মানবাধিকার পরিস্থিতিও মূল্যায়ন করেন। বিনিয়োগকারীরাও একইভাবে একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক পরিবেশ এবং আইনি কাঠামোর ওপর আস্থা খোঁজেন।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কেবল প্রতীক নিয়ে বিতর্ক এড়ানো নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শ্রমিক অসুস্থ হলে তিনি সময়মতো চিকিৎসা পাবেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা পাবে। কারণ একটি দেশের মানবিক পরিচয় তার মানুষের প্রতি আচরণের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।

আজ আমাদের নিজেদের কাছে কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন রাখতে হবে। কেন এখনো প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনায় শ্রমিক মারা যাচ্ছেন? কেন একই ধরনের অভিযোগ বারবার ফিরে আসছে? কেন শ্রমিকের মৃত্যু কয়েক দিনের মধ্যেই জনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়? কেন জাতীয় বাজেটে শ্রমিকের নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাস্থ্যকে আরও দৃশ্যমান অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না? কেন উন্নয়নের আলোচনায় শ্রমিকের জীবন প্রায়ই পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা পড়ে যায়?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু সরকারের কাছে নয়—নিয়োগকর্তা, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক সংগঠন, গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ সবারই এখানে দায়িত্ব রয়েছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা কেবল আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়; এটি একটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দায়িত্ব।

বিশ্বকাপ শেষ হবে, বিদেশি পতাকা নামবে। সাদা পতাকা নিয়েও বিতর্ক একদিন স্তিমিত হবে। কিন্তু লিজা আক্তারের পরিবারের শোক শেষ হবে না, তাঁর সহকর্মীদের প্রশ্নও থেকে যাবে। সেই প্রশ্ন কেবল একটি কারখানার নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং উন্নয়নের দর্শনের প্রতি ছুড়ে দেওয়া প্রশ্ন।

বড় চ্যালেঞ্জ শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়

বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধিকে মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে রূপান্তর করা। এমন একটি উন্নয়ন, যার কেন্দ্রে থাকবে মানুষ—বিশেষ করে সেই শ্রমজীবী মানুষ, যাঁদের শ্রম, ঘাম ও ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে।

একটি রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু জিডিপি, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ কিংবা রেমিট্যান্সের পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের মানদণ্ড হলো একজন শ্রমিক কর্মস্থলে কতটা নিরাপদ, অসুস্থ হলে কত দ্রুত চিকিৎসা পান, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাঁর পরিবার কত দ্রুত ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও সামাজিক সুরক্ষা পায়। শ্রমিকের জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কখনোই পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নের প্রতীক হতে পারে না।

একটি দেশের প্রকৃত মর্যাদা তার পতাকা কত উঁচুতে উড়ছে তাতে নয়, বরং সে দেশ তার নাগরিকদের কতটা মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারছে তাতেই প্রমাণিত হয়। সেই পতাকার নিচে কাজ করা প্রতিটি শ্রমিকের জীবন কতটা নিরাপদ, তাঁর অধিকার কতটা সুরক্ষিত এবং তাঁর মর্যাদা কতটা সম্মানিত—তার মধ্যেই সেই রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় নিহিত থাকে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী জাতীয় পরিচয় হওয়া উচিত এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে, যেখানে শ্রমিক কেবল উৎপাদনের উপকরণ নন, বরং উন্নয়নের অংশীদার; যেখানে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ন্যায্যতা ও মানবিক মর্যাদা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার; এবং যেখানে কোনো লিজা আক্তারের মৃত্যু আর নিছক একটি পরিসংখ্যান হয়ে হারিয়ে যায় না, বরং প্রতিটি শ্রমিকের জীবন রক্ষায় রাষ্ট্র, নিয়োগকর্তা ও সমাজের সম্মিলিত দায়বদ্ধতার নতুন অঙ্গীকারে পরিণত হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...